মহামারীর সময় তৈরি হওয়া গাড়ি সংকট এখনো ব্যবহৃত বা পুরনো গাড়ির বাজারে বড় প্রভাব ফেলছে। ফলে দেশটিতে পুরনো গাড়ির দাম প্রতিনিয়ত বাড়ছে, এমনকি এক দশকের পুরনো গাড়ির দামও এখন আকাশছোঁয়া বলে এক প্রতিবেদনে জানিয়েছে সিএনবিসি। বিশ্লেষকদের মতে, এর মূল কারণ চাহিদা ও জোগানের ভারসাম্যহীনতা।
অটোমোবাইল খাতের বিশ্লেষকরা বলছেন, মহামারীর কারণে নতুন গাড়ি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছিল। সে ধাক্কা এখন এসে লেগেছে পুরনো গাড়ির বাজারে।
কক্স অটোমোটিভের প্রধান অর্থনীতিবিদ জেরেমি রব জানান, মহামারী চলাকালীন উৎপাদন বন্ধ ও কাঁচামালের সংকটের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অন্যান্য সময়ের তুলনায় প্রায় ৮০ লাখ গাড়ি কম তৈরি হয়েছে। বিপুল পরিমাণ গাড়ি বাজারে না আসায় শুরুতেই একটি বড় শূন্যতা তৈরি হয়। এছাড়া ওই সময় উৎপাদন কমে যাওয়ায় গাড়ি নির্মাতারা সস্তা গাড়ির বদলে বেশি মুনাফা দেয় এমন বিলাসবহুল গাড়ি তৈরিতে মনোযোগ বাড়ায়। মহামারীর পরেও তারা এ কৌশল ধরে রেখেছে।
জেডি পাওয়ারের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট টাইসন জোমিনি জানান, ২০১৬ সালের রেকর্ড ১ কোটি ৭৫ লাখ বিক্রির তুলনায় গত কয়েক বছরে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রায় ১ কোটি ৬০ লাখ কম গাড়ি বিক্রি হয়েছে। এটি প্রায় পুরো এক বছরের গাড়ি বিক্রির পরিমাণের সমান।
এর বাইরে গাড়ি নির্মাতা ও ডিলাররা এখন গাড়ি লিজ (ভাড়া) দেয়া ও বিশেষ ছাড় দেয়ার মতো প্রচলিত সুবিধাগুলো অনেক কমিয়ে দিয়েছে।
রব বলেন, গাড়ি নির্মাতাদের জন্য লিজ দেয়া বেশ ব্যয়বহুল। সাধারণত লিজে মাসিক কিস্তি কম থাকে, নির্মাতাদের অগ্রিম খরচ বেশি হয় ও লিজের মেয়াদ শেষে গাড়িটি আবার পুরনো গাড়ির বাজারে বিক্রি করতে হয়।
বর্তমানে নির্মাতারা ট্রাক, এসইউভি ও প্রিমিয়াম মডেলের গাড়ি বেশি তৈরি করছে, যা বেশ দামি ও এগুলো লিজে কম পাওয়া যায়।
তিনি আরো জানান, মহামারীর আগে নতুন গাড়ির বাজারের প্রায় ৩০ শতাংশ ছিল লিজের অধীনে। ২০২২ সালে তা কমে ১৮ শতাংশে নেমে আসে। সাধারণত একটি গাড়ির লিজের মেয়াদ হয় তিন বছর। ফলে তিন বছর পর ব্যবহৃত গাড়ির বাজারে যে সরবরাহ আসার কথা ছিল, তা এখন মারাত্মকভাবে কমে গেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষ এখন উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জ্বালানি তেলের বাড়তি দাম এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির মুখোমুখি। প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাজারে গাড়ির দাম প্রায় এক-তৃতীয়াংশ বা ৩৩ শতাংশ বেড়েছে, কিন্তু সে তুলনায় মানুষের আয় বা বেতন বাড়েনি। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের একটি সাধারণ পরিবারের গড় বার্ষিক আয় ৮০ হাজার ডলার। অন্যদিকে একটি নতুন গাড়ি কেনা পরিবারের গড় বার্ষিক আয় ১ লাখ ৫০ হাজার ডলারের বেশি। ফলে মধ্যবিত্ত ও নিম্নবিত্ত ক্রেতারা নতুন গাড়ি কেনার সামর্থ্য হারাচ্ছেন।
কক্স অটোমোটিভের তথ্য বলছে, বাজারে এখন ৯-১০ বছরের পুরনো গাড়ির চাহিদাও অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি। দাম বাড়ার কারণে মানুষ বাধ্য হয়ে ফের পুরনো ও সস্তা গাড়ির দিকে ঝুঁকছে।
বিশ্লেষকদের মতে, বড় কোনো অর্থনৈতিক পরিবর্তন না হলে আগামী তিন থেকে চার বছরের মধ্যে ব্যবহৃত গাড়ির বাজারে সরবরাহ পরিস্থিতির বিশেষ কোনো উন্নতি হবে না। ফলে চড়া দামই এখন গাড়ি বাজারের ‘নতুন স্বাভাবিক বিষয়’ বা নিউ নরমাল হয়ে দাঁড়িয়েছে।